কাল কোরবানির ঈদ “নেই স্বজনদের খোঁজ” ময়লা-আবর্জনার মাঝে অসহায় এক বৃদ্ধা মায়ের মানবেতর জীবন
কাল কোরবানির ঈদ “নেই স্বজনদের খোঁজ” ময়লা-আবর্জনার মাঝে অসহায় এক বৃদ্ধা মায়ের মানবেতর জীবন
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
আসন্ন পবিত্র কোরবানির ঈদকে ঘিরে যখন চারদিকে আনন্দ-উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। সেখানে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে এক অসহায় বৃদ্ধা নারী কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।
প্রায় ৭০ বছর বয়সী ওই নারী সন্তান-স্বজনহীন অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন খোলা আকাশের নিচে। তার পরিচয় কিংবা বাড়ি কোথায় তা কেউ জানেন না।
জানা গেছে, প্রায় এক বছর ধরে তিনি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের একটি পরিত্যক্ত ভবনে বসবাস করছিলেন। তবে গত এক মাস ধরে টানা ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পরিষদ চত্বরে মোটরসাইকেল রাখার একটি টিনশেডের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানেই কোনোমতে দিন কাটছে তার।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি অপরিষ্কার মাটির হাঁড়িতে আলু ও ঢেঁড়স একসঙ্গে সিদ্ধ করছেন তিনি। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা ও ছেঁড়া কাঁথা। রাত হলে সেখানেই ময়লা কাপড় জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েন এই বৃদ্ধা।
যেখানে সুস্থ মানুষের এক মুহূর্ত অবস্থান করাও কঠিন, সেখানে তিনি প্রায় বছর ধরে নিজেকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। ছেলে-মেয়ে আত্মীয় স্বজনের খোঁজ না পেয়ে টানা এক বছর ধরে বেওয়ারিশ অসহায় বৃদ্ধার নিদারুণ কষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছে। যেন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার আপন বলতে কেউ নেই !
ওই বৃদ্ধা নারীর বাড়ি ফুলবাড়ী নাকি লালমনিরহাট এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমি ফুলবাড়ী কিংবা লালমনিরহাট কোথাও যাব না, এটাই আমার বাড়ি।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট বাজারের দুধ বিক্রেতা মোঃ ইসরাফুল ইসলাম বলেন, কি বলবো ভাই, প্রায় প্রতিদিনই ওই নারীকে এক পোয়া করে দুধ দেই। তার বাড়ি কোথায় কেউ জানে না। খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। কথা বললেও নিজের ঠিকানা বলতে পারেন না। মনে হয় কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। ময়লা-আবর্জনার মাঝেই থাকছেন। জানি না কোনোদিন তার পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পশ্চিম ফুলমতি ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ শহিদুল ইসলাম জানান, ওই বৃদ্ধা নারীর অবশ্যই তার পরিবার রয়েছে। তবে তিনি কোনোভাবেই বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নন। পরিবারের সদস্যদের সন্ধান পাওয়ার আশায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারীর ছবি পোস্ট করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, “আমি নিজেও কয়েকদিন তাকে খাবার দিয়েছি। খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। বাজারের মানুষের সহানুভূতিতে দু’বেলা খাবার জোটে। এভাবে তো একজন মানুষের জীবন চলতে পারে না। নিশ্চয়ই তারও পরিবার, সন্তান বা আত্মীয়-স্বজন আছে। কিন্তু কী কারণে তিনি এখানে এসে পড়েছেন, তা জানা যায়নি। বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমরা চাই, আপনার প্রতিবেদনের মাধ্যমে তার পরিবার তাকে খুঁজে পাক।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ হাছেন আলী বলেন, “ওই নারী আমাদের এলাকার নন। কেউ তাকে চিনেন না। তবে দীর্ঘদিন ধরে পরিষদ চত্বরে অবস্থান করছেন। আমরা মাঝে মাঝে তাকে খাবার দিই। আগে পরিষদের পেছনের একটি পরিত্যক্ত ভবনে থাকতেন, পরে গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে সামনে টিনশেডের নিচে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি কথা বলতে পারেন, কিন্তু নিজের নাম-ঠিকানা কিছুই জানান না। আমার ধারণা, তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। আমরা দোয়া করি, তিনি যেন আবার তার পরিবারকে ফিরে পান।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোছাঃ দিলারা আক্তার জানান, বিষয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুত ওই বৃদ্ধা নারীর জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, অসহায় ও ভবঘুরে মানুষের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। ঈদের ছুটি শেষে অফিস খোলার পর সমাজসেবা বিভাগের সহযোগিতায় ওই বৃদ্ধা নারীকে রংপুরের ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তাকেও জানানো হচ্ছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স